Wednesday, November 28, 2007

ঘূর্নিঝড় “সিডর” এবং অর্ন্তনিহিত ভয়ানক রাত্রির অভিজ্ঞতা

Title of this post: “Cyclone Sidr and experience of a horrible night” by Laily Jahan Meghla
Content of this post: In this post writer expressed her feelings on a horrible night of cyclone sidr.

জীবনের বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতার সাথে মানুষের পরিচয় ঘটে। দৈনন্দিন জীবনের গতানুগতিকতার মধ্যে এমন কিছু খন্ডমুহূর্ত আসে যেগুলো স্বাতন্ত্র ও অর্ন্তনিহিত স্মৃতির তালিকায় রেখায় চিহ্নত হয়। এই প্রথম নিজের চোখে দেখা ঘুর্নিঝড়
সিডর রাত্রিকে ঘিরে সেরকম রেখাঙ্কিত স্মৃতি আমার জীবনে কতবার কতভাবেই তো ঝড় হয়েছে কাল অকালে শিতে-গ্রীষ্মে, বর্ষায় একটি ঘুর্নিঝড়ের ভয়ঙ্কর রাত্রি স্মৃতিগুলোকে বিশেষত্ব ও স্বাতন্ত্রে তুলে ধরতে চেষ্ঠা করেছি।

আমাদের দেশে ১৯৯১ সালে ২৯ই এপ্রিলের রাতে চরম দুঃখের ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছিল। তখন আমি খুব ছোট ছিলাম। কোন কিছু আমার মনে নেই। বড় হয়ে পরিবার থেকে যতটুকু শুনেছি তা রক্তাক্ত হৃদয়ের আহাজারি এবং হাজারো মানুষের ক্ষয়ক্ষতি। এই দিন উপকূলীয় অঞ্চলের হাতিয়া, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম এবং নোয়াখালী চর বরকত সহ প্রায় সমগ্র অঞ্চল প্রচন্ড ঘুর্নিঝড় আর জল্লোচ্ছাসে ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়। এই প্রথম নিজের চোখে দেখা ঘুর্নিঝড় সিডর বাংলাদেশে অতিক্রম করে গেছে। ঢাকা অফিস জানিয়েছে সিলেট পার হওয়ার সময় ঝড়টি দুর্বল হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে এখন এর প্রভাব মুক্ত। গত বৃহস্পতিবার(১৫.১১.০৭) রাতে আঘাত হানা ঘুর্নিঝড় সিডর এর আয়তন ছিল দুই লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার। একলাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বাংলাদেশে ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। এ বিশাল আয়তনের ঝড়টি ওই দিন রাত আটটার পর হারিকেনের শক্তি নিয়ে সিডর দক্ষিন উপকুল দিয়ে উঠে পৌনে তিনটার দিকে উত্তর পূর্বে সিলেট দিয়ে ভু-খন্ড অতিক্রম করবে। এই খবরগুলো বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার করেছে এবং ১-১০ নম্বর বিপদ সংকেত দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। সেদিন সকাল থেকে কালো কালো পুঞ্জিভুত মেঘ স্তবকে স্তবকে পরিগ্রহ করছিল ঘনরূপে। সারাদিন আকাশ তোলপাড় করে ঝড়ো হাওয়া বইছিল। মেঘাচ্ছন্ন সারাটি দিন রাতের মতো প্রতিভাত হয়েছিল। রাতের প্রথম প্রহরে শুরু হল নিমর্ম নিষ্ঠুর প্রচন্ড ঝড়। রাত দশটার পর ঢাকায় শুরু হল ঝড়ের মহাপ্রলয়ের তান্ডবনৃতা। আর এদিকে বিদুৎ নেই অনেক সময় ধরে। আমার পরিবার যার যার রুমে সবাই ঘুমাতে চলে গেলো। আমি আর আমার ছোট ভাই একই রুমে ঘুমাই। জানালার কপাটে পট পটকের শব্দ হচ্ছে বাইরে বাতাসের শন শন শব্দ প্রচন্ডভাবে কানে শুনা যাচ্ছে। আমার ছোট ভাই ভয়ে আমার বড় বোনের রুমে ঘুমাতে চলে গেল। এখন আমি বড় একা হয়ে গেছি, ভয়ের পরিমান আরও তিনগুন বেড়ে গেলো। ঝড়ের লন্ডভন্ড তছনছ করে দিচ্ছে সব। আমারা ৫ম তলায় থাকি। আমার মনে হচ্ছে এই বুজি বিল্ডিং ভেংগে যাবে। জীবনের শেষ রাত্র বুঝি আজকে। আমার মনের ভিতরে এইসব কথা চিন্তা হচ্ছে। আমি আমার বন্ধু-বান্ধব এর কাছে ফোন করতে চাইলাম কিন্তু কোন নেটওয়ার্ক পাচ্ছিনা। অবশেষে রাত্র ১২-১০ মিনিটে আমার বড় ভাইয়ের একটি ফোন আসল আমরা কেমন আছি তা সে জানতে চাইল এবং ঘুমাতে বলল, কিন্তু তখন বাইরে প্রচন্ড বাতাসের শব্দ আর তাই শুনে আমার ভিতরে তখন দারুন উত্তেজনা। দরজা খুলে বাইরের অবস্থা দেখতে ইচ্ছা করছে কিন্তু মোটেও সাহস পাচ্ছিলাম না। জানালর ফাঁক দিয়ে দৃষ্টি দিলে মনে হল বাতাস আমাকে টেনে নিয়ে যাবে। অন্ধকারের সমুদ্র যেন সহসা উত্তাল, ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে আকাশে বিদুৎতের চমক এ মেঘের গর্জনে ধরনী খন্ড-বিখন্ড হওয়ার উপক্রম। ভাবলাম পৃথিবীর অন্তীম দশা উপস্থিত আর কয়েক মূহুর্তের মধ্যে ধ্বংসের অতলে তলিয়ে যাবে। আমি আল্লাহর কাছে আমার গুনাহ্ মাপের জন্য প্রার্থনা করছি। আমার আর ভাল লাগছে না কেবল ঝড় থামার অপেক্ষায় আছি। তখন রাত ২:০০টা বাজে। বাতাসেরর শব্দ প্রচন্ড বেড়ে গেছে আমি আমার বন্ধুর কাছে ফোন করলাম এবং কথা বললাম তখন মনে মনে স্থথির অনুভব করলাম। সে আমাকে নানাভাবে আশ্বস্ত করল এবং ঘুমাতে বলল কিন্তু তবুও আমার ভয় থেকেই গেল এবং ঘুমাতেও পারলাম না। রাত্র তিনটার পর ঝড় কিছুটা থামতে লাগলো। সারাটা রাত্র একফোঁটা ঘুমাতে পারলাম না কিন্তু সকালে চিন্তা করলাম কখন বিদুৎ আসবে এবং কখন খবর দেখব যে দেশের কি অবস্থা। কিন্তু দু্ইদিন একটানা বিদুৎ ছিল না এবং বিদুৎ না থাকার দরুন পানিও ছিল না। সংবাদপত্র পড়ে জানলাম পটুয়াখালী, বাগেরহাট, সুন্দরবন, বরিশাল, চট্টগ্রাম দেশের উত্তর ও দক্ষিন অঞ্চলে ক্ষয় ক্ষতির পরিমান অনেক বেশি হয়েছে। রেডক্রিসেন্ট ধারন করেছে যে মৃতের সংখ্যা ১০,০০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই ধরনের সংবাদ পড়ে আমার মনটা আরও বেশি খারাপ হয়ে গেল। সবচেয়ে বেশি মন খারাপ হল প্রথম আলোর একটা সংবাদ পড়ে যে, শরীয়তপুরে ১৫.১১.০৭ তারিখ সকালে একটি মেয়ে শিশু জন্ম গ্রহণ করেছে সকালে পৃথিবীর মুখ দেখেছে মেয়েটে আর রাতের ঘূর্নিঝড়েই নিভে গেল তার জীবনের প্রদীপ।

বাস্তবিকই ঝড়ের এমন দুলর্ভ আভিজ্ঞতা আমার আর কখনো হয়নি। ঘূর্নিঝড় সিডর রাত্রের সেই নিদারুন অভিজ্ঞতায় যে, প্রকৃতির মধ্যে শান্তির যেমন প্রলেপ আছে, তেমনি আছে ধ্বংসের তান্ডব নৃত্য। সেই ঝড়ের রাত্রির নিদারুন অভিজ্ঞতা আমার মনের দুঃস্বপ্নের স্মৃতি হয়ে গেঁথে থাকবে অনাদিকাল।