Thursday, September 11, 2008

নির্যাতিত অবলা

Title of this post: Woman who faced violence by Sufiya Akter

অনেক দিনের একটা ইচ্ছা ছিল নার্সিং র্কোস শেখার। ইচ্ছা পূরন ও হয়েছে। আমি ছিলাম নারী জীবন প্রজেক্টের একজন নিয়মিত ছাত্রী এবং বাংলা ব্লগের একজন নিয়মিত লেখিকা। সব ছেড়ে চলে এলাম নার্সিং র্কোস শিখতে কুমিল্লার ব্রাম্মনবাড়িয়ায়, একটা অপরিচিত যায়গা। প্রথম প্রথম সমস্যা হচ্ছিল। এখন একটু দ্বিধাবোধ কেটে গেছে। তো যাই হোক। আমি যেখানে থাকি এটা একটা হাসপাতাল। নতুন হাসপাতাল বলে রোগীর সংখ্যা কম। দিনে ১০-১২টা রুগী আসে। আলাদা কোন র্নাস নেই। আমরা এখানে শিখি এবং পাশাপাশি র্নাসিং এর দায়িত্ব পালন করি। বিভিন্ন ধরনের রুগী আসে। তাদের সেবা করি। ভালই লাগে।

কিছু দিন আগে সকালে একটা রুগী এসেছে। দৌড়ে গেলাম রুগীটাকে দেখতে। প্রয়োজন মত সেবা দেয়াও শুরু করলাম। রোগীটি ছিল মহিলা। প্রথমবস্থায় বুঝতে পারিনি যে রোগীটির কি হয়েছে। কিন্তু পরে জানতে পারলাম মহিলাটি স্বামী ও শ্বাশুড়ীর নির্যাতনের স্বীকার। তাকে এত পরিমানে মারধর করেছে যার ফলে তার জীবন নিয়ে টানাটানি। মহিলাটিকে যথেষ্ট পরিমানে চেষ্টা করলাম সুস্থ করে তুলতে। কিন্তু পারলাম না ।আমাদের ডাক্তার তাকে শহরের বড় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু পাষন্ড স্বামী তা মেনে নিলো না। বলল, “আপনারা যা পারেন তাই করেন। না পারলে বলেন আমি বাড়ি নিয়ে যাই।” ডাক্তার বলল, “আপনার স্ত্রীর অবস্থা খুব খারাপ। এই মুহুর্তে বাড়ি নিয়ে গেলে কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।” লোকটি বলল,”ঘটুক সমস্যা নাই”। স্যার কিছু না বলে আরেকটা রুগী দেখতে চলে গেল। আমি ও আমার সাথে যারা আছে আমরা রুগীটির কাছে থাকলাম। আমি রোগীটিকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার এঅবস্থা কিভাবে হয়েছে। রোগীটি কথা বলতে পারছে না, শুধু চোখের পানি ফেলছে আর বলছে আমাকে খুব মেরেছে। তার মুখ থেকে কোন কথা বেড়োচ্ছে না । অবলা নির্যাতিত নারীদের জীবনে কোন স্বাধীনতা নেই। আছে শুধু একটি স্বাধীনতা আর তা হল চোখের জল ফেলা। আর কিছু বলতে হল না তাকে আমি বুঝতে পারলাম ইনি একজন স্বামীর নির্যাতনের স্বীকার। সান্তনা দেয়ার ভাষা ছিল না। তবু ও যেহেতু সেবিকার পোষাক পড়েছি সেহেতু কিছু না কিছু সান্তনা দিতে তো হবেই তাই সান্তনা দিলাম। জরুরি বিভাগে রোগীটির স্যালাইন চলছে। রুম থেকে হাসপাতালের বারান্দায় এসে দেখি মহিলার সেই পাষন্ড স্বামী দাঁড়িয়ে আছে। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনার স্ত্রীর সমস্যাটা কি? লোকটি বলল, “কি আর সমস্যা, ওরে পেত্নিতে পাইছে, অয় সারা জীবন আমারে জালাইছে। খালি খালি কোন কারণ ছাড়াই অজ্ঞান হইয়া যায়।” তখন আমার খুব রাগ হচ্ছিল। আমি তখন নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি। বলে ফেললাম এটা কোন কথা? আপনি এখনো পেত্নিতে বিশ্বাস করেন। নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম , “এধরনের বাজে কথা রোগীর সামনে বলা ঠিক না। আপনি তার স্বামী, আপনি যদি তাকে সান্তনা না দেন তবে কে দেবে?” আপনি সবসময় তার পাশে থাকবেন এবং স্যার যেটা বলল সেটা করেন, ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। এই বলে আমি চলে এলাম রিসিপসনের রুমে। ঐ যে আগেই বলেছি এটা নতুন হাসপাতাল তাই রিসিপসনের জন্য আলাদা কোন লোক নেই। অবশ্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। যাই হোক আমি রিসিপসনে গিয়ে বসলাম। ওখানে আরো ও মেয়েরা ছিল। গিয়ে দেখি মধ্য বয়স্ক একজন পুরুষ ও মহিলা এবং ছোট একটা বাচ্চা ওখানে বসে আছে। তারপর জানতে পারলাম যে তারা অসুস্থ মহিলার বাবা এবং মা। তারা উভয়েই কাদঁছে। আমি ও আমার রুমমেট তাকে সান্তনা দিলাম এবং বললাম, আপনার মেয়েকে কি সবসময় এরকম অত্যাচার করে? তিনি বললেন “হ সব সময়ই করে, বিয়ার পরেততেই এমন করে।” তখন আমার রুমমেট জোরে চেঁচিয়ে বলল, “আপনারা এর পদক্ষেপ নেন না কেন?” তারা বলল, “শুধু মাত্র এই নাতিটার মুখের দিকে তাকাইয়া সহ্য কইরা আছি।” কাথাটা শুনে একবার ইচ্ছে হল আরও কিছু বলি কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও উপায় ছিল না। এর মধ্যেই পাষন্ড সেই লোকটি এসে হয়ত বা আমাদের সব কথা শুনে ফেলেছিল। তাই তার শ্বাশুড়ীকে ধমক দিয়ে বলল, “এই বেটি এহেনে কি?” মেয়ে জামাইয়ের কথায় মহিলাটি ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি ওখান থেকে ওঠে চলে গেলো। লোকটি আরও অনেক কটু কথা বলল তার শ্বশুর এবং শ্বাশুড়ীকে। আমাদের বলার কিছু ছিল না। শুধু পাষন্ড লোকের পাষন্ডতম ব্যবহারগুলো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখলাম। ঐ এলাকার কিছু মেয়ে আছে আমাদের সাথে নার্সিং শেখে। ওরা বলল লোকটি নাকি খুব খারাপ। বড় ছোট মানে না প্রচন্ড বেয়াদপ।

৩০-মিনিট সময় যেতে না যেতেই দেখলাম মহিলাটিকে রিক্সায় তুলছে। দেখে খুশি হলাম ভাবলাম সদর হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভাগ্য যখন খারাপ হয় তখন ভাগ্যকে ভাল করার কোন রাস্তা থাকে না। কিছুক্ষণ পর জানলাম ওনাকে সদর হাসপাতালে না নিয়ে বাড়িতে নিয়ে গেছে। বুঝতে পারলাম মহিলাটির ভাগ্যে শুধু নির্যাতন জুটলো কিন্তু সু-চিকিৎসা জুটলো না। একেই কি বলে নারীর অধিকার? এ কেমন অধিকার যার ফলাফল শুধু নির্যাতন অন্যায়, অত্যাচার, অবজ্ঞা আর অবহেলা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কথা আমার মনে পড়ে গেল-

“অবহেলিত অসহায় নারীদের
বিচারের বানি নিরবে নিভৃতে কাঁদে”

একথাটা কি আজ সত্যি হয়ে গেল? মনে হচ্ছে তাই। একটা মেয়ে বাবার আদর মায়ের স্নেহ, ভালোবাসা ভুলতে চায় শুধু তার স্বামীর ভালোবাসা পাবার জন্য। অথচ সেই ভালোবাসাই যদি না পায় তবে একটা মেয়ের জীবনে আর কি থাকতে পারে? বাবা, মায়ের ভালোবাসার আঁচল ছেড়ে শ্বশুর, শ্বাশুড়ীর আঁচলে আশ্রয় নেয়। অথচ সেই শ্বশুর শ্বাশুড়ী যদি তাদের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই অসহায় মেয়েটি কোথায় যাবে? র্নিযাতিত অসহায় নারীর আর্তনাদ চিৎকার আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে,গাছের পাতা ঝড়ে পড়ছে। তবুও পাষন্ড স্বামীর মন গলে না। জানিনা মহিলাটি বেঁচে আছে কি না? নাকি পাষন্ডের নির্যাতন সহ্য করছে। সরকার নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে। তারপরেও নারী নির্যাতন বেড়ে চলেছে দিনের পর দিন। অবলা নারীদের বর্তমান জীবনটা ধাপে ধাপে চলছে। প্রথম ধাপ বাবা মায়ের সংসারে দুঃখে কষ্টে মানুষ হওয়া। তার পর বিয়ে। শ্বশুর বাড়ি যাওয়া। শ্বাশুড়ীর ও স্বামীর নির্যাতনের স্বীকার হওয়া। অবশেষে ফলাফল মৃত্যু। এটাই কি বর্তমান নারীদের পরিচয়? এর কি কোন প্রতিকার নেই? আমরা নারী এটাই কি আমাদের অপরাধ? না তা কিছুতেই হতে পারে না। আমাদের অগ্রাধিকার চাই। আমরা সুন্দর ভাবে বাচঁতে চাই। আমরা ভালোবাসা দিতে চাই। ভালোবাসা পেতে চাই। আমরা স্বাধীনতা চাই। এটা আমাদের চাওয়া, এটা আমাদের আকাঙ্খা।

অসীম ইচ্ছা

Title of this post: Unlimited wills by Afiya Akter

জানিনা কি চাও তুমি
তবে মনে মনে ভাবি আমি
তুমি কাছে আসলে
আমার পাশে বসলে
আমার পৃথিবী থমকে যায়
নিজেকে সে প্রকাশ করতে পারে না
আমার পৃথিবীর স্বপ্নরা স্বপ্ন
দেখতে ভীষম ভয় পায়।
অনুভবে অভিমানে সে
নিজেকে গুটিয়ে রাখতে চায়
আপন অক্ষমতায় সে নিরবে
নিরব হয়ে থাকে।

গ্রামের নারী ও শহরের নারী

Title of this post: Women from rural and urban area by Jainub Khanam

নারী-গ্রামের হোক
, শহরের হোক, আধুনিক কিংবা সাধারন হোক, চালাক হোক কিংবা আনাড়ী- তার পরিচয় কিন্তু একটাই, সে নারী। কিন্তু আমি যা নিয়ে ভাবছি তা হলো - নারীতে নারীতে কত তফাৎ? আমার জন্ম গ্রামে। তাই খুব কাছ থেকে গ্রামের মেয়েদের জীবন যাত্রা আমি দেখেছি। বিয়ের পরে আমার স্বামী আমাকে ঢাকা নিয়ে আসে। আমি এখন ঢাকা শহরে থাকি। তাই শহরের মেয়েদের জীবন যাত্রা ও আমি কাছ থেকে দেখেছি। শহর আর গ্রামের নারীদের জীবনে কত পার্থক্য ? গ্রামে বেশির ভাগ নারী লেখাপড়ায় খুব একটা জোর দেয় না। কোন রকম এস.এস.সি পাশ করতে পারলেই অনেক কিছু। কয়েক জন ব্যতীক্রম অবশ্যই আছে। আমি আমাদের এলাকার কথাই বলছি। ৯ম বা ১০ম শ্রেণীতে পড়লেই বাবা মায়েরা বিয়ের কথা ভাবেন। এরপর কোন একটা পাত্র বিদেশী হলে ভাল হয়। বয়স বাবার বয়সের হোক, সমস্যা নেই, প্রচুর টাকা আছে। লেখা পড়া কম, সমস্যা নেই, মোহরানা দেবে ৫লাখ। আমার মনে হয়, বাবা-মার জ্ঞানহীন ধ্যান ধারণার জন্যই মেয়েদের এই অবস্থা। মায়েরা ছোটবেলা থেকেই মেয়ের মনে একটা ধারণা তৈরী করে দেন যে, “তোমরা নারী”। মক্তবে কোরান শরীফ শেষ করবে, বাংলা শিখে চিঠি পত্র লিখতে পারলেই হবে, তার পর বিয়ে দেব, বাচ্চা পালন, সংসার গুছানো ব্যাস তোমার দায়িত্ব শেষ।

অথচ সংসার সুন্দর করে গুছানোর জন্য
, সংসার কে সুখী করার জন্য, স্বামীর সঠিক মূল্যায়ন, বাচ্চার সঠিক যত্ন, পরিবারের অন্যদের সাথে ভালব্যবহার, সবার প্রতি দায়িত্ববোধ, সচেতনতা এসব গুরুত্বপূর্ন বিষয়গুলোর জন্য উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক অর্থাৎ ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করতে হবে, সব কাজে পারর্দশী হতে হবে। গ্রামের মায়েরা এসব কখনোই ভাবেন না। এতো গেলো অবিবাহিতা মেয়েদের কথা, এবার বউদের কথায় আসি। তারাতো স্বামীর বাড়ীতে এসে রাজরানী। সংসারের চাবী তার শাড়ীর আঁচলে, স্বামীর টাকা তার ড্রয়ারে। ইচ্ছে মত, খেয়াল মত সংসারে কর্তৃত্ব খাটায় তারা। আমাদের বাড়ির বউরা এত সুখি। সকালে উঠে নাস্তা খেয়ে উঠানে বসে সবাই আড্ডা দেয়। ১০ টায় বাচ্চাদের স্কুলে পাঠায়। ১১টায় বা ১২ টায় রান্না করে হিটার বা সিলিন্ডার গ্যাসে । দুপুরে খেয়ে ঘুম দেয়, বিকালে নাস্তা খেয়ে আবার আড্ডা দেয়। সন্ধ্যায় ঘরে যায়। বাচ্চাদের পড়ালে পড়ায় না পড়ালে নাই। ৮টা বাজলে টিভি ছাড়ে ১০/১১ টা পর্যন্ত দেখা হয়। এরপর ঘুম। বউদের চিন্তা বা কোন টেনসন নেই বাজারের। স্বামীরা সবকিছু এনে হাজির করে। তাদের গল্প, হাসি তামাশায় কেটে যায়। ঘড়ির দিকে তাকানোর প্রয়োজন যেন নেই। অথচ শহরের নারীর জীবন গ্রামের নারীর জীবন থেকে সম্পূর্ন ভিন্ন। শহরের নারীরা একরকম সংগ্রামী জীবন কাটায়। তাদের সময় চলে ঘড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে। বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া, আনা, ঘর গুছানো, বাজার করা, রান্না করা, বাচ্চাকে কোচিং এ নেওয়া, গান, ড্রয়িং শিখাতে নেওয়া, সময় মত ঘুম পাড়ানো, রাত্রে রান্না সেরে আবার বাচ্চাকে পড়ানো, নিজের পড়া, ব্যক্তিগত কাজ, সবই তারা করছে দক্ষতার সাথে। আমি দেখেছি আমার চতুর্পাশের বেশির ভাগ মেয়ে অনেক পরিশ্রমী। অবিবাহিতা মেয়েরা ও অলস সময় কাটায় না। তারা উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি কম্পিউটার, গ্রাফিক্স ডিজাইন, সেলাই, অত্যাধুনিক রান্না সহ আরো বিভিন্ন কোর্স শিখে নিজেকে দক্ষ, কর্মঠ ও সাবলম্বী করছে। সারাদিন তারা কাজের মধ্যেই সময় কাটায়। অবশ্য গ্রামে সুযোগ সুবিধা ও কম। চাইলেই তারা কম্পিউটারে বসতে পারে না। ইন্টারনেটে বিচরন করতে পারে না।