Wednesday, December 19, 2007

প্রতিভার বিলুপ্তী

Title of this post: Abolished talent Sufia Khatun

সবেমাত্র এইচ ,এস,সি পাস করেছিআমি ও শিল্পী, আমরা দুই বান্ধবী একসাথে চলতাম, কোথাও যেতে হলে একসাথে যেতাম, দুই জনের মধ্যে ছিল গভীর মিল, কারন আমরা দুই জন ৬ষ্ট শ্রেনী থেকে এইচ.এস.সি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছিএক এক করে দুই জনে মনে করলাম একসাথে যে কোন বিশ্ববিদ্যায়ে ভর্তি পরীক্ষা দিবোকিন্তু ভাগ্যের পরিহাস দুইজনেরই একই সমস্যা টাকার জন্য কোন বিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে পারলাম নাআমি এবং আমার ক্লাসের অন্য সব বান্ধবীদের তুলনায় শিল্পী করেছিল ভাল রেজাল্ট টাকার সমস্যার কারনে থেমে গেলো দুইজনের চলার পথক্লাসের মধ্যে শিল্পী ছিল সবচেয়ে গরীব ও মেধাবী ছাত্রী ওর বাবা কোন রকম মাছ বিক্রি করে সংসার চালাতভাল ছাত্রী ছিল বলে স্কুলও কলেজ এর তহবিল থেকে ওকে অনেক সাহায্য করতঅধিকাংশ সময় সহায্যের উপর নির্ভর করে ওর লেখা পড়া চলেতোআমি ঐ বছরেই বি. ভর্তি হয়ে গেলামকিন্তু শিল্পী ভর্তি হতে পারল না ওর বাবা মনে করল, মেয়েকে আরও যদি পড়ানো হয় তবে, তার মেয়েকে ভাল একটা পাত্রের হাতে তুলে দিতে পারবে নাকারন সে একজন গরীবতাই সে তার মেয়েকে পড়াবে নাআমি বুঝালাম, বিয়ে হওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপারকিন্তু ও শিক্ষি হলে ভাল চাকুরী করতে পারবেআপনার সংসারের অভাব অনটন দুর করে দেবে
ওর বাবা বলল, মেয়ে মানুষ কি করবে? ছেলে হলে একটা কথা ছিল

ওর বাবাকে কিছুতেই বুঝাতে পারলাম নাব্যর্থ র্হয়ে ফিরে এলাম বাসায়মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলোএর মধ্যে অনেক জায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসতে লাগলকেউ শিক্ষক কেউ ভাল চাকরীজীবিঐ দারিদ্রতাই হল ওর চরম শত্রু গরীব দেখে সবাই পিছিয়ে যায়এভাবেই চলতে থাকে প্রায় ৬ মাসহঠাৎ একদিন কলেজ থেকে এসে শুনি ওর আগামী শুক্রবার বিয়েছেলে অনেক বড়লোকবিশাল বড় ব্যবসায়ীকথাটা শুনে খূব খুশি হলামবিয়ের দিন হাজির হলাম ওর বাড়িতেগিয়ে দেখি বেনারশিতে ওকে এত সুন্দর লাগছিল যা দেখে সবাই চেঁচিয়ে উঠলামবিয়ে হয়ে গেলোবিদায়ের বেলায় হঠাৎ আমার কানে এল ছেলে নাকি কোন লেখাপড়া জানেনাএমন কি ছেলে কসাইসে বাজারে গোশত কেটে বিক্রি করেকিন্তু স্বাভাবিকের তুলনায় টাকা-পয়সা একটু বেশিশুনে মাথা গরম হয়ে গেলকি করব বুঝতে পারছিনাচ্ছে হল সবকিছু ফেলে, বিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে আসিকিন্তু পারলাম নাএকদিকে সমাজ অন্য দিকে বান্ধবীর মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে স্থি করে চুপটিকরে বসে রইলামঅন্য এক জনের কাছে জানতে পারলাম এ বিয়েতে নাকি শিল্পী নিজে মত দিয়েছেওর কথা মতই এই বিয়ে হচ্ছেশুনে ওর প্রতি ঘৃনা জন্মে গেলোওর প্রতি আমার একটাই রাগ, সে কেন একটা শিক্ষিত মেয়ে হয়ে একটা অশিক্ষিত ছেলেকে বিয়ে করলকাউকে কিছু জানতে দিলাম নাচলে এলাম বাসায়তারপর ওর সাথে আর দেখা কারার চেষ্ঠা করলাম না ও একদিন আমার সাথে দেখা করতে আসলোজানিনা কেন এমন ব্যবহার করেছিলাম ওর সাথেআমার মনে হয় যাকে বেশি ভালবাসা যায়তার প্রতি রাগ হয় পাহাড় সমানকেননা সবাই চায় তার প্রিয় মানুষটি সবর্দা সুখে থাকুক যাই হোক তা প্রায় ৬ মাস পর ওর সাথে

দেখা করার চেষ্টা কারলাম কিন্তু দেখা হলো না ওর সাথেতার আগই আমি অসুস্থ হয়ে পড়লামকোন ডাক্তার আমার রোগ ধরতে পারল নাআমি ধীরে ধীরে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লামচিকিৎসা নিতে চলে এলাম ঢাকয়কিছুতেই ভাল হলাম নাবনধ হয়ে গেলো আমার লেখাপড়াথেমে গেলো আমার জীবন বাধা পড়ে গেলো দুই জনের চলার পথ এরই মাঝে একটু সুস্থ হলামফিরে গেলাম দেশে একদিন হাটাতে, হাটতে ওদের বাড়িতে গেলামআমাদের গ্রামেই ওদের বাড়ি ওর সংগে দেখা হল নাওদের বাড়িতে গিয়ে যা শুনলামতাতে ওর প্রতি যে রাগ ছিল তা ধুয়ে মুছে গেলো শুরু হল সমাজের প্রতি ঘৃনাদারিদ্র্যের প্রতি ঘৃনাদারিদ্র মানুষকে কোনদিন সুখ তো দেয়ই না বরং সুন্দর সাজানো একটা জীবন ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়মাদের দেশে যৌতুক অতি সাধারন ও গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছেএ দেশের দারিদ্র বাবারা মনে করেন মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়া হল একটা ভিশাপজন্মের পরে একটা মেয়ের পিছনে কত কিছু খরচ করতে হয় তার বাবাকেতার জীবন পরিচালনা থেকে শুরু করে লেখাপড়া এবং দায়িত্ব, কত খরচএকটা ছেলের বেলায় ও এইকোন কিছুর কমতি নেইকিন্তু বিয়ের সময় ছেলের বেলায় কোন নিয়ম নেইঅথচ মেয়ের বেলায় কত রকম ধান্দাবাজীশিল্পীর বাবা এতই গরীব ছিল যে, মেয়ের বিয়েতে যৌতুক হিসেবে নগদ টাকা দেওয়া তো দুরের কথা সাধারনত ভাত খাওয়ার একটা থালা দেবে সেটাও দেয়ার সমর্থ তার ছিলনা

আমাদের দেশে এমন একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, শিক্ষিত মেয়ের জন্য একটা শিক্ষিত পাত্র খুঁজতে হলে তাকে সেভাবে সাজিয়ে দিতে হবেছেলেকে দিতে হবে, ছেলের ঘর সাজিয়ে দিতে হবেঅতএব বাধ্য হয়ে শিল্পির মত এমন অনেক প্রতিভাবান মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে ও অশিক্ষিতের সাথে সারাটা জীবন কাটাতে হচ্ছে পৃথিবী সম্পর্কে অনেক কিছু জানা থাকলেও তাকে বাস করতে হচ্ছে ঘরের কোনেযা শুধুমাত্র তার জীবনকে বিষন্ন করে তোলেবাবাকে যাতে বসত ভিটেটুকু না হারাতে হয় সে জন্য শিল্পীকে বিক্রি করে দিতে হয়েছে অশিক্ষিত একটি স্বামী ও স্বামীর সংসার না আর হয় নি ওর সাথে দেখা আমি চলে এলাম ঢাকয়ওর জন্য আমার মনটা এখনো কাদেহয়ত ওর স্বামী টাকা পয়সা আছেশিল্পী সুখেই আছে কিন্তু শিল্পী কি মানসিক দিক দিয়ে সুখী? বাংলাদেশে এইড্‌স রোগের বিজ্ঞাপনের স্লোগানটি হল বাঁচতে হলে জানতে হবে ব্যাপারে সবাই অবগত আছেএটা থেকে সবাই বাঁচতে চায়, কিন্তু আমাদের দেশের প্রতিটা নারীর জীবনে এই যে যৌতুক নামের জীবানুটা ঢুকে গেছেএ থেকে বাঁচার উপায় কি? বাংলাদেশ কি দারিদ্রতা থেকে মুক্তি পাবে নাবাংলাদেশের নারীর কি যৌতুক থেকে মুক্তি পাবে নাআজ আমার বান্ধবীর হয়েছেকাল আমার হবেপরশু আর এক জনের হবেসমাজের সমস্ত বিত্তবান এবং শিক্ষিত বুদ্ধিমান মানুষের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন বিভিন্ন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা তারা কি বাংলাদেশকে এই দারিদ্রতা ও যৌতুকের মত রোগ থেকে বাঁচাতে পারবে না?................