Saturday, March 22, 2008

হয়রানি

Title of this post: Harassment by Sufiya Khatun

২০ শে ডিসেম্বর ২০০৭ ইং তারিখে ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের বাড়িতে রওনা দিলামআমি,ভাইয়া ও আমার মামাগাবতলি গিয়ে দেখি প্রচুর লোকের ভীঅনেক কষ্টে ভাইয়া তিনটা টিকেট কাটলফেরী পারাপারের কোন গাড়ি পাওয়া গেল নাবাধ্য হয়েই লঞ্চ পারাপারে গাড়ি নিতে হলতারপরেও বেশ ভালই লাগছিলবাড়িতে যাচ্ছি একথা মনে পতেই আনন্দে হৃদয়টা নেঁচে উঠছিল বার বারএকসময় গাড়ি হঠাৎ থেমে গেলোকি হয়েছে? কি হয়েছে? বাস থেকে নামলামনেমে মামাকে জিজ্ঞাসা করলাম
মামা বলল প্রচন্ড ট্রাফিক জ্যাম একদম আরিচা ঘাট পর্যন্ত
আমি মামাকে আবার জিজ্ঞাসা করলাম মামা এই স্থানটির নাম কি?
মামা বলল, মানিকগঞ্জ" । তার মানে মানিকগঞ্জ থেকে শুরু করে একটানা আরিচা ঘাট পর্যন্ত জ্যামএখন কি করি?

অবশ্য মনে মনে ভালই লাগছিলএকপাশে ঘর-বাড়ি,গাছ-পালা এক কথায় গ্রাম, আর এক পাশে ধূ ধূ করা মাঠআর সেই মাঠে হলুদ কার্পেট বিছিয়ে দেয়া হয়েছে হলুদ সরিষার ফুলে মাঠ ভরেগেছে একটানা চার ঘন্টা পথ ধরে ধীরে ধীরে এগোতে লাগলাম আরিচার দিকেএক সময় জ্যাম ছাড়ল আরিচায় পৌঁছে গেলামলঞ্চ ঘাঁটে পৌঁছে দেখি শুধু মানুষ আর মানুষভাইয়াকে বললাম ভাইয়া কিভাবে যাব? এ দেখি হাঁটা পর্যন্ত অসম্ভবতারপরেও দেখি লঞ্চের অভাব যে পরিমান লোক, তার উপযুক্ত পর্যাপ্ত পরিমান লঞ্চ নেইনেই লঞ্চ, নেই নদী পথের অন্য কোন যানবাহন, নেই উপযুক্ত নিয়ম শৃঙ্খলাআছে শুধু মানুষ আর মানুষভাইয়া বলল ট্রলারের ব্যবস্থা করতে হবেনয়ত লঞ্চে ঢুকলে মানুষের চাপেই মারা যাব

কথাটা প্রায় ৯০% সত্যি হচ্ছিলো অল্পের জন্য বেঁচে গেছিযাই হোক বললাম যে টার্মিনালে ঢুকবোনাকিন্তু কিভাবে যে র্টামিনালে ঢুকলাম তা আমরা নিজেরা ও জানি না মামা বলল, ঢুকে যখন পড়েছি বেরোনো যাবে না
একথা বলতে না বলতেই পিছন থেকে ঢেউ এর মত একটা ধাক্কা এলচলে গেলাম অনেক দূরেঅনেকক্ষণ পর একটা লঞ্চ আসলচোখের পলকে লঞ্চটা চলেও গেল তার মানে লঞ্চ আসতে দেরি যেতে দেরি নাইহঠাৎ চিৎকার শুনলামহালকা করে যা দেখলাম, তাতে বুঝলাম একজন মহিলা ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেছেতার পরনে ছিল শাড়িমধ্যবয়স্ক সেই মহিলা মানুষের পায়ের নিচে আহাজারী করছে কিন্তু উঠতে পারছে নাসেই সময়টার এমন অবস্থা ছিল যে, মানুষ তাকে হাত ধরে উঠাবে কি? তার গায়ের উপর দিয়ে সবাই লঞ্চে উঠছেঅনেকক্ষণ পর পর একটি লঞ্চ আসছে আর মানুষ যে কিভাবে উঠছে তা শুধুমাএ স্বচোক্ষে দেখানো ছাড়া লিখে বোঝানো যাবে নাআমার হাতে ছিল দুটি ব্যাগ, মামার হাতে ছিল একটি ব্যাগ, ভাইয়ার হাতেও একটি ব্যাগ অবশ্য তাদের ব্যাগ গুলো ছিল বড়আর আমার হাতের ব্যাগ ছিল ছোটহঠাৎ একটা লঞ্চ এল, মানুষ উঠছেহঠাৎ চিৎকার শুনতে পেলামমায়ের কোল থেকে বাচ্চা ছিটকে গিয়ে পানিতে পড়ে গেলোলঞ্চ ছেড়ে দিয়েছেমা চিৎকার করে উঠলোঅমনি দুটো লোক পানিতে ঝাপ দিয়ে পড়লবাচ্চাটাকে সঙ্গে সঙ্গে উঠালোচোখ ফেরাতে না ফেরাতেই দেখলাম আর একজন মহিলা পড়ে গেলো পানিতেঅবশ্য তাকেও উঠানো হয়েছেকিন্তু এই যে হয়রানি এটা থেকে রক্ষা দেবে কে? সামান্য কিছু নিয়ম শৃঙ্খলার অভাবে হাজারো মানুষের প্রাণ ভেসে যাচ্ছে যাওয়ার একমাত্র পন্থা এই আরিচা ঘাঁটযাইহোক আরিচা ঘাটে দেখা হয়েছিল আমার এক চাচাতো ভাইয়ের সাথেধরিয়ে দিলাম ওর হাতে আর একটা ব্যাগ ও আমাদে অনেক সাহায্য করেছিলএল পিছন থেকে আর ও একটি ধাক্কাআমরা মোট চার জন ছিলাম কিন্তু ধাক্কা খেয়ে চারজন চারদিকে ছিটকে পড়লামআমি ভাইয়ার হাত ধরেছিলাম এখন আর কাউকে দেখিনামনে মনে আল্লাহকে ডাকছিলামআমি চিৎকার দিলামভয়ে কেঁদেও ফেললাম

হঠাৎ একটা ছেলে আমার হাত চেপে ধরে বলল, ভয় নেই তোমার, ল্লাহ ভরসাবুকে একটু সাহস এলখেলাম আর একটা ধাক্কা চলে গেলাম লঞ্চের মাথায়যাই হোক কথায় বলে না? আমি লঞ্চের মাথায় উঠলাম কি নদীতে পড়ে যাচ্ছিলামআর অমনি সেই ছেলেটি আমার হাত চেপে ধরলোছেলেটি হাত না ধরলে আমি নির্ঘাত লঞ্চের নিচে চলে যেতামনিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাকে টেনে উপরে উঠালোআমি নতুন জীবন ফিরে পেলামসত্যি বলতে কি যখন পড়ে যাচ্ছিলাম বা মানুষের চাপের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম তখন ভাইয়া মামার কার ও কথা মনে ছিলনাশুধু নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ শুরু করলামযাইহোক যখন লঞ্চে উঠে এক পাশে ছেলেটা আমাকে দাঁড় করিয়ে দিলো ঠিক তখনই আমার ভাইয়ার কথা মামার কথা মনে পড়ে গেলো এখন চিন্তা করছি ভাইয়া কোথায়, মামা কোথায়? কাঁদতে লাগলামছেলেটি আমাকে সান্তনা দিতে লাগলজিজ্ঞাসা করল, তোমার সাথে আর কে আছে? ” আমি বললাম,“আমার ভাইয়া আর মামা ছেলেটি বলল,তারা হয়ত ভালভাবেই আছে। আমি কাঁদছি আর বলছি তারা ভাল থাকবে কিভাবে? তারা তো চাপেই মরে যাবেআমি কাঁপছি ছেলেটির সাথে ছিল আরো দুজনজানিনা তারা সর্ম্পকে আত্নীয় কিনাওদে মধ্যে একজন আমাকে পানি দিল বলল চিন্তা করবেন না,পানি পান করুব্যস্থা একটা হবেইছেলেটা বলল তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? আমি বললাম, আমি তো সাঁতার জানি না

ছেলেটা বলল, আমরা ও জানিনাতুমি পড়ে গেলে কি আমরা বসে থাকতামআবার বলল আমরা তো আছি ভয় কিসের? তোমার ভাইয়ার সাথে দেখা না হলে, আমরা তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসব, তোমার বাড়ি কোথায়? আমি বললাম মাগুরাচসে

ছেলেটি বলল, সমস্যা নেই আমি বাড়ি ঐদিকেইতারপরেও সে আর একটি স্থানের নাম নাম বলছিলহয়ত তার থানার নাম অথবা গ্রামের নামকিন্তু ভাগ্য খারাপ আমার তা মনে নেইকিছুক্ষণ পরে মামাকে দূর থেকে দেখলামঐ একই লঞ্চে মামামামা আমাকে খুঁজছেআমি দেখতে পাচ্ছি কিন্তু ডাকতে পারছি না ছেলেটা আমাকে বলল, তোমার ব্যাগ দুটো আমরা দেখছি, তুমি তোমার মামাকে খুঁজে নিয়ে আস
আমি ভীড়ের মধ্যে ঠেলে আস্তে স্তে গেলাম মামা আমাকে দেখলো আর বলল,“মা ভয় নেই তোরতুই ওখানেই থা, আমি রিপনকে ফোন দিচ্ছি কিন্তু পাচ্ছি না

রিপন আমার ভাইয়ার নামআমি তখন আরো ভয় পেয়ে গেলামছেলেটার কাছে ফিরে এলামআমাকে জিঞ্জাসা করলো পেয়েছেন”? আমি বললাম, পেয়েছি

লঞ্চ ঘাঁটে ভিভাবলাম নামতেও মনে হয় অনেক কষ্ট হবেকিন্তু তা আর হল নাছেলেটার সাথে ভাল ভাবেই নামলাম। মামার সাথে ছেলেটার পরিচয় করিয়ে দিলামপরিচয় আর কি? বললাম উনার উছিলায় আমি মৃত্যুর হাত হতে রক্ষা পেয়েছিভীড়ের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের গাড়ির কাছে পৌছে গেলামকিন্তু আমি কাদঁছি ভাইয়ার জন্যমামা আমাকে সান্তনা দিলছেলেটা মামার কাছ থেকে বিদায় নিলআমাকে শুধু বলল আসিআমি মাথা নাড়ালামকিছুই বলতে পারলাম নাগাড়িতে উঠলামআশেপাশের সিটের সবাই ভাইয়াকে ফোন দিচ্ছে কিন্তু পাচ্ছে নাঅনেকক্ষন অপেক্ষা করার পর ভাইয়া আসলগাড়ি ছেড়ে দিলচাচাতো ভাইটাকে ও পেলামকিন্তু আমার মনের মধ্যে একটাই ভাবনা হচ্ছিলছেলেটাকে ভাল করে একটা ধন্যবাদ ও দিতে পারলাম নানিজের কাছে খুব খারাপ লাগছেনিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছেহয়ত বা সে এ ঘটনা ভুলে যেতে পারে কিন্তু আমি ভুলতে পারবনাতার সাথে হয়ত কখনো দেখা হবেনাকিন্তু তার ব্যাবহার, তার উপকার মনে থাকবে আমার আজীবন

এই যে, কিছু নিয়ম-শৃঙ্খলার অভাবে মানুষের জীবন চলে যাওয়া অথবা মানুষের এই যে হয়রানি এ থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন উপায় আছে কি? সরকার এত কিছুর সু-ব্যাবস্থার পদক্ষেপ নিয়েছে কিন্তু সাধারন সু-ব্যাবস্থার অভাবে বড় কিছু ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছেমানুষের যাতায়াত ব্যবস্থার দিকে একটু দৃষ্টি দিলে হয়ত সাধারন মানুষ সস্তি পাবে যেমন নদীপথের যানবাহনের সু-ব্যাবস্থা বিশেষ করে র্টামিনাল গুলোকে আরও প্রসার সুন্দর নিয়মের দ্বারা বেঁধে দিলে এসব হয়রানীর হাত থেকে সাধারন মানুষ বেঁচে যাবে